আইন করে বন্ধ হোক পহেলা বৈশাখে ইলিশ খাওয়া! কথাটা শোনার সাথে সাথেই আপনার শরীর গরম হয়ে যেতে পারে। আমাকে রাজাকার, মৌলবাদ ইত্যাদি বলে গালিও দিয়ে দিতে পারেন। কেননা আপনার ধারণা বাংলার ঐতিহ্যের বিপক্ষে আমি কথা বলছি; কথা বলছি বাঙ্গালীর সব থেকে বড় সার্জজনীন উৎসবের একটা ট্রেন্ড নিয়ে। দিন, যত খুশি গালি দিন। তারপরও নিচের লেখাটুকু পড়ুন। তারপর আমি নিশ্চিত যে আমাকে গালি না দিয়ে আপনি তখন গালিটা অন্য কাউকে দিবেন, আর দুঃখ প্রকাশ করবেন আমাকে গালি দেবার জন্য।

বাঙ্গালীর ইতিহাসে পহেলা বৈশাখ একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অনন্য অনুষ্ঠান। প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে এই অনুষ্ঠান। আর পহেলা বৈশাখ নাম শুনলেই আমাদের মাথায় আরও দুটি শব্দ ঘুরে, আর তা হলো পান্তা ভাত, এবং ইলিশ। আপনি ইচ্ছঅ মত পান্তা খান, গরম ভাতেই পানি ঢেলে পান্তা বানায় খান, খাইতে খাইতে মইরা যান, তাতেও আমি কিচ্ছু বলবো না। এমনকি সারা বছর গরীবেরা যে পান্তা খেয়ে পেটে আলসার বাধায়, সেই পান্তা খেয়ে যদি আপনি তাকে কালচার বলেন তাতেও আমার কোন কিছু বলবার নাই। তবে হ্যাঁ, যদি আপনি ইলিশ খাইতে চান। আমি আপনাকে বলবো হত্যাকারী, নির্বোধ, দেশদ্রহী! ইলিশ খাওয়া নিশ্চই হত্যার সামিল হতে পারে না; তবুও কেন হত্যার কথা বললাম? কেন দেশদ্রোহীতার কথা বললাম? অপেক্ষা করেন, বলছি। তার আগে আমরা একটু দেখবো কেন পান্তা-ইলিশ ঐতিহ্য নয়।

২০১১ সালের এপ্রিল মাসের ১১ তারিখে বিডিনিউজ২৪ এ সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল নামের একজন লেখক রমনার বটমূলে পান্তা-ইলিশের সূচনা শিরোনামে একটি লেখা লিখেছেন। সেখানে তিনি দাবি করেন যে ১৯৮৩ সালে তিনি সহ আরও কয়েকজন মাথা মোটা মানুষ মিলে চিন্তা ভাবনা করে পান্তা ইলিশকে নববর্ষের খাওনের লিষ্টের মধ্যে ঢুকান। এখানে তিনি প্রায়াত বোরহান নামে একজনকে প্রথম ক্রেডিটটা দিলেন; এবং নিজে ক্রেডিট নিলেন ইতিহাস ঠিক রাখার। তার প্রতিবাদে আর এক মাথা মোটা সাংবাদিক শহিদুল হক খান দাবী করলেন যে তিনিই এটার উদ্যোগ নিয়েছেলেন, বোরহান নামের ঐ ভদ্রলোক নন।

এ নিয়ে তিনি বিস্তর এক ক্যাচাল করেছেন, কিন্তু ফাঁকতলে যা হয়েছে, ইতিহাস সাক্ষী হয়ে গেলো; আর হয়ত আমার এই লেখাটাও সাক্ষী হয়ে থাকবে। কেননা আমি অন্য কাউকে এ নিয়ে তাদেরকে দোষারোপ করে লিখতে দেখি নি। যাই হোক, আসি মূল কথায়। এবার আপনাদের বলবো কেন আমি এদের লাগাতার মাথামোটা-নির্বোধ বলে যাচ্ছি।

মার্চ থেকে এপ্রিল, এ সময়টা ইলিশ মাছের মা হওয়া, এবং ডিম পাড়বার সময়। আপনি হয়ত জানেন না যে ইলিশ মাছ মুরগীর মত দিনে একটা ডিম দেয় না; এক সাথে শত শত ডিম দেয়। মার্চ থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত সময়ে এরা মা হয়, এর পর দেয় ডিম। সেই ডিম থেকে বাচ্চা হতে হতে মোটামুটি আমার জানা মতে মে এবং জুনের মাঝামাঝি। আর এই মার্চ এবং এপ্রিলে ইলিশ মাছ ধরা মানে সেই মে-জুন পর্যন্ত তাদের না পৌছাতে দেওয়া।

একটি ইলিশ যদি ১০০ বাচ্চাও ফুটাতে পারে, তার মানে দাড়ায় আপনি আমি পহেলা বৈশাখে ১টি ইলিশ খাচ্ছি না; আসলে ১০১টি ইলিষ ধ্বংস করছি। কেন ধ্বংস করছি? কারণ কিছু মাথা মোটা আমাদের বুঝিয়েছে যে পান্তা ইলিশ বাংলার ঐতিহ্য! এবার হিসাব করেন, বাংলাদেশে যদি পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মাত্র ৫০,০০০ ইলিশ ধরা হয়, এবং তা বিক্রি করা হয়; তাহলে আদতে আমরা কি কয়েক লক্ষ ইলিশ মাছ ধ্বংস করছি না? এ কথাটা পড়েই আপনি মনে মনে বলবেন, আহারে বলদ, আমি একা খাওয়া থামাইলেই কি আর সবাই থামাবে? আমি বলবো, হায়রে চালাক, তুমি একলা না খাইলে অন্তত ১০১টা ইলিশ তো রক্ষা পাবে। আমি-তুমি-আমরা এভাবে একজন একজন করে ছাড়তে ছাড়তেই এক সময় সংস্কৃতির নামে এই হত্যার হোলি বন্ধ হবে। এবার বলেন আমি যদি বলি আপনি পহেলা বৈশাখে ইলিশ মাছ খাওয়াকে ইলিশ হত্যা বলি, ক্ষতি হবে কি?

এবার আসেন কেন দেশদ্রোহী বললাম। তার আগে উত্তর দেন, আপনি কি আপনার বাপ-দাদার কাছে ইলিশের গল্প শুনেন নাই? শুনেন নাই যে তখন এত এত ইলিশ পাওয়া যেত, ইলিশের দাম এত কম ছিলো, এক বাড়ির ইলিশের ঘ্রাণ ৫-১০ বাড়ি পর্যন্ত পৌছে যাইতো ইত্যাদি ইত্যাদি? যদি শুনে থাকেন, তাহলে এবার আবার চিন্তা করেন। আপনি একটি ইলিশ কিনে এনে, পহেলা বৈশাখে ইলিশ খেয়ে বাংলা ঐতিহ্য ইলিশ ধ্বংস করছেন। আপনি একটি জাতির ঐতিহ্য ধ্বংস করবেন, আর আমি আপনাকে দেশদ্রোহী বলবো না?

প্রশ্ন এসেছেঃ আমি যেই মাছটা কিনে এনে ফ্রিজে রেখেছি; সেটার কি করবো? আমার উত্তর, ভাই, মাছটা পরের দিন খান, সন্তানকে বুঝান যে এটা কত বড় অন্যায়। কিনে যেটা ফেলেছেন সেটা বদলানো যাবে না, কিন্তু অভ্যাসতো বদলাবে।

ভাই, হাতে ধরি, পায়ে ধরি, নববর্ষ উপলক্ষে ইলিশ খাইয়েন না। বাংলাদেশে আরও অনেক মাছ আছে, অনেক সুস্বাদু মাছ আছে। পান্তা যদি খাইতেই হয় তাইলে মাংস বা কাঁচা মরিচ বা শুকনা মরিচ ভেজে তা দিয়ে খান। কাঁচা মরিচ – শুকনা মরিচ দিয়ে পান্তা খাওয়াটা আসলেই প্রচলিত। যে গরীবের কাছ থেকে পান্তার ধারণা এসেছে, সেই গরীবের কখনোই সাধ্য হয় না ইলিশ কিনে খেতে। পান্তা-মরিচই আসল বাংলার ঐতিহ্য; পান্তা ইলিশ নয়।